নালন্দা ভারতের বিহার রাজ্যের পাটনা জেলার অন্তর্গত ছিল। বর্তমানে নালন্দা একটি স্বতন্ত্র জেলা। গৌতম বুদ্ধ অনেকবার নালন্দায় এসেছিলেন। তিনি এখানে শ্রেষ্ঠীপুত্র পাবারিকের আম বাগানে অবস্থানকালে তাঁর শিষ্যদের ধর্ম দেশনা করেছেন। এখানে অনেক ধনী ব্যক্তি বসবাস করতেন। কয়েকজন ধার্মিক ও ধনী ব্যক্তি ভূসম্পত্তি ক্রয় করে বুদ্ধকে দান করেন। নালন্দা ছিল একটি উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী মহানগরী।
নালন্দা নামের উৎপত্তি নিয়ে অনেক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তার মধ্যে দুটি ব্যাখ্যা প্রধান। একটি হলো, অতীতকালে এখানে বোধিসত্ত্ব নামে এক ব্যক্তি রাজত্ব করতেন। তিনি কখনো কাউকে 'নঅলদা' অর্থাৎ 'আমি দেব না' একথা বলতে পারতেন না। সে কারণে এ স্থানের নাম হয় নালন্দা। আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, স্থানীয় এক আম বাগানের মধ্যস্থলে একটি পুকুর ছিল। সেখানে নালন্দা নামক এক নাগরাজ বাস করতেন। তার নাম অনুসারে এ জায়গার নাম হয় নালন্দা।
জানা যায় গৌতম বুদ্ধের অগ্রশ্রাবক সারিপুত্রের জন্ম হয়েছিল এই নালন্দায়। পরবর্তীকালে সম্রাট অশোক অগ্রশ্রাবকের স্মরণে এখানে একটি সুবৃহৎ সংঘারাম নির্মাণ করেছিলেন। সেটি নালন্দা মহাবিহার নামে খ্যাত হয়। খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে বিখ্যাত বৌদ্ধ পন্ডিত ও দার্শনিক নাগার্জুন নালন্দা মহাবিহারের অধ্যক্ষ ছিলেন। বিহারটিকে কেন্দ্র করে পরবর্তীকালে গড়ে উঠে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। অনুমান করা হয়, খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতকের পর নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্বে ছোট ছোট বিহার, চৈত্য, স্তূপ ইত্যাদি নির্মিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে এ সকল স্থাপনার সমন্বয়ে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছিল জগৎ বিখ্যাত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসস্তূপ
ইতিহাস পাঠে জানা যায়, কনৌজের রাজা হর্ষবর্ধন ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য এখানকার গ্রামের সমুদয় কর নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করেছিলেন। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে নালন্দায় আসেন। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সপ্তম শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত অবস্থান করেন এবং জ্ঞানার্জনের জন্য অধিকাংশ সময় ব্যয় করেন। বাংলার কৃতী সন্তান মহাপণ্ডিত ভিক্ষু শীলভদ্র তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ছিলেন। বাংলার শান্তরক্ষিত ও অতীশ দীপঙ্করও একসময় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ছিলেন।
বৌদ্ধধর্ম-দর্শন চর্চার প্রাণকেন্দ্র ছিল নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়।
ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুসারে এখানে 'ধর্মগঞ্জ' নামে একটি বিরাট পাঠাগার ছিল। পাঠাগারে ছিল মূল্যবান অনেক পান্ডুলিপি ও গ্রন্থ। বাংলার পাল রাজাদের আমলে নালন্দার খ্যাতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। তাঁরা বিহারের ব্যয় ও শিক্ষা কেন্দ্রের সমৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বহু অর্থ ও জমি দান করেন। রাজা ধর্মপাল সবচেয়ে বেশি পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তখনকার দিনে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়া গৌরবের বিষয় ছিল। এ বিদ্যাপীঠের পাঠ্যক্রমের উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল বৌদ্ধ, বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য বিষয়ক সাহিত্য, দর্শন, অলঙ্কার শাস্ত্র, ব্যাকরণ শাস্ত্র, জ্যোতিষ শাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা প্রভৃতি। এ ছাড়া সাধারণ জ্ঞানের নানা বিষয়ও ছিল। এ পাঠ্যক্রমের অনুসারী ছাত্ররা নিয়মানুবর্তীতা, শিষ্টাচার, গভীর পান্ডিত্য ও আদর্শগত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তাঁরা দেশ বিদেশে যথেষ্ট সুনাম ও প্রশংসা অর্জন করেছিলেন।
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই অবয়ব আর নেই। সব কিছু আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে সে ধ্বংসাবশেষের নিদর্শনগুলো সংরক্ষিত আছে। ভারতের বিহার রাজ্যের সরকার বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়ন ও গবেষণার জন্য বর্তমানে 'নব নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়' নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছে। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা অনুসরণ করে এটি নির্মিত হয়েছে।
অনুশীলনমূলক কাজ |
Read more